মোলের ধারণা ও রাসায়নিক গণনা

রাসায়নিক বিক্রিয়া সম্পন্ন করার সময় কী পরিমাণ রাসায়নিক পদার্থ বিক্রিয়ক হিসেবে ব্যবহার করেন, কী, পরিমাণ উৎপাদ ও পার্শ্ব উৎপাদ এবং কী পরিমাণে অপ্রয়োজনীয় পদার্থ উৎপন্ন হয় তা রসায়নবিদগণের হিসাব করা প্রয়োজন হয়। বিশেষ করে রাসায়নিক শিল্পে আর্থিক বিবেচনায় এই হিসাব অত্যাবশ্যকীয়। এজন্য রাসায়নিক বিক্রিয়ায় ব্যবহৃত ও উৎপন্ন পদার্থের অণুর সংখ্যা, অণুতে পরমাণু ও আয়নের সংখ্যা গণনা করতে হয়। রসায়নবিদগণ অণু, পরমাণু ও আয়ন গণনার জন্য একটি বৃহৎ সংখ্যা ব্যবহার করেন। এই সংখ্যার মান 6.023 × 10²³ । 6.023 × 10²³ সংখ্যক অণু, পরমাণু বা আয়ন ধারণকারী পদার্থের পরিমাণকে মোল বলে। রসায়নে অণু পরমাণু বিক্রিয়ক, উৎপাদ ইত্যাদি হিসাব নিকাশ স্টয়কিওমিতি নামে পরিচিত।

অধ্যায়ের বিষয়বস্তু সংশ্লিষ্ট শীর্ষস্থানীয় বিজ্ঞানী

আমেদিও অ্যাভোগাড্রো: আমেদিও অ্যাভোগাড্রো (৯ আগস্ট ১৭৭৬ – ৯ জুলাই ১৮৫৬) ইতালীয় রসায়নবিদ। তাঁর নামানুসারে অ্যাভোগাড্রো সংখ্যার নাম রাখা হয়েছে। এটি একটি ধ্রুবসংখ্যা, যা N দ্বারা সূচিত হয়। N = 6.023 × 10²³। বিভিন্ন পদ্ধতিতে অ্যাভোগাড্রো সংখ্যার নির্ণীত মানের মধ্যে পার্থক্য অতি সামান্য। উনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধেই সর্বপ্রথম গ্যাসের গতিতত্ত্ব থেকে এ মান প্রাক্কলন করা হয়। N এর সবচেয়ে নির্ভুল মান পাওয়া যায় রঞ্জনরশ্মি পরিমাপ এবং ঘনত্ব উপাত্ত থেকে। অতি সাম্প্রতিকালের পরিমাপসমূহ থেকে এর যে মান পাওয়া গেছে তা হলো 6.02210 × 10²³।

জন ডাল্টন: রসায়নবিদ, পদার্থবিজ্ঞানী ও আবহাওয়াবিদ জন ডাল্টন (৬ সেপ্টেম্বর ১৭৬৬ ২৭ জুলাই ১৮৪৪) আধুনিক পরমাণুতত্ত্ব প্রস্তাবনার জন্য বিখ্যাত। ২৭ বছর বয়সে তিনি ম্যানচেস্টার কলেজে গণিত ও দর্শন বিষয়ের ওপর শিক্ষকতা করেন। ১৮০০ সালে তিনি 'গ্যাস প্রসারণ সূত্র' ও 'গ্যাসের চাপ সূত্র' প্রকাশ করেন। আবিষ্কার করেন গ্যাসের তরলীকরণের উপায়। তিনি পরমাণুর সাংকেতিক চিহ্ন ও পরমাণুর ওজন নিয়েও গবেষণা করেন। কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৮২৬ সালে ডাল্টন রয়েল সোসাইটি কর্তৃক পুরস্কৃত হন।

এক নজরে বিভিন্ন যৌগের রাসায়নিক নাম ও সংকেত

যৌগের রাসায়নিক নাম সংকেত যৌগের রাসায়নিক নাম সংকেত
সালফিউরিক এসিড H2SO4 ম্যাগনেসিয়াম নাইট্রেট Mg(NO3)2
অ্যালুমিনিয়াম সালফেট Al2(SO4)3 ম্যাগনেসিয়াম অক্সাইড MgO
গ্লুকোজ C6H12O6 সোডিয়াম কার্বনেট Na2CO3
বেনজিন C6H6 অ্যালুমিনিয়াম অক্সাইড Al2O3
ইথিন C2H4 ব্লু ভিট্রিওল/তুঁতে CuSO4·5H2O

এক নজরে বিভিন্ন রাসায়নিক বিক্রিয়া

1. 2H2 + O2 → 2H2O
2. C(s) + O2(g) → CO2(g)
3. 2Mg(NO3)2   Δ   2MgO + 4NO2 + O2
4. Mg + 2HCl → MgCl2 + H2
5. Na2CO3 + HCl → NaCl + H2O + CO2
6. Al2O3 + 6HCl = 2AlCl3 + 3H2O
7. 2Mg(s) + O2(g) → 2MgO(s)

গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

মোল: কোনো পদার্থের যে পরিমাণের মধ্যে 6.023 × 10²³টি পরমাণু, অণু বা আয়ন থাকে সেই পরিমাণকে ঐ পদার্থের মোল বলা হয়।

অ্যাভোগেড্রো সংখ্যা: অ্যাভোগেড্রো সংখ্যার মান 6.023 × 10²³

মোলার আয়তন: এক মোল গ্যাসীয় পদার্থ যে আয়তন দখল করে তাকে ঐ গ্যাসের মোলার আয়তন বলে। প্রমাণ অবস্থায় 1 মোল গ্যাসের আয়ন 22.4 লিটার।

মোলার দ্রবণ: একটি নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় 1 লিটার দ্রবণের মধ্যে যদি এক মোল দ্রব দ্রবীভূত থাকে তাকে ঐ দ্রবণকে মোলার দ্রবণ বা এক মোলার দ্রবণ বলা হয়।

দ্রব: দ্রাবকে যে পদার্থ দ্রবীভূত করে দ্রবণ প্রস্তুত করা হয় তাকে দ্রব বলে। লবণ পানির মিশ্রণে লবণ দ্রব এবং পানি দ্রাবক।

মোলারিটি: একটি নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় 1 লিটার দ্রবণের মধ্যে যত মোল দ্রব দ্রবীভূত থাকে তাকে ঐ দ্রবণের মোলারিটি বলা হয়।

সেমিমোলার দ্রবণ: 1 লিটার দ্রবণের মধ্যে 0.5 মোল দ্রব দ্রবীভূত থাকলে ঐ দ্রবণকে সেমিমোলার দ্রবণ বলা হয়।

ডেসিমোলার দ্রবণ: 1 লিটার দ্রবণের মধ্যে যদি 0.1 মোল দ্রব দ্রবীভূত থাকে তবে ঐ দ্রবণকে ডেসিমোলার দ্রবণ বলে।

শতকরা সংযুতি: কোনো যৌগের 100 গ্রামের মধ্যে কোনো মৌল যত গ্রাম থাকে তাকে ঐ মৌলের শতকরা সংযুতি বলে। 

মৌলের শতকরা সংযুতি = (মৌলের পারমাণবিক ভর × পরমাণুর সংখ্যা × ১০০%) ÷ যৌগের আণবিক ভর

স্থূল সংকেত: যে সংকেত দ্বারা অণুতে বিদ্যমান পরমাণুগুলোর অনুপাত প্রকাশ করে তাকে স্থূল সংকেত বলে।

রাসায়নিক বিক্রিয়া: যে প্রক্রিয়ায় এক বা একাধিক মৌল বা যৌগ রাসায়নিক পরিবর্তনের মাধ্যমে নতুন এক বা একাধিক মৌল বা যৌগে পরিণত হয় তাকে রাসায়নিক বিক্রিয়া বলে। অর্থাৎ যে প্রক্রিয়ায় রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটে সেই প্রক্রিয়াকে রাসায়নিক বিক্রিয়া বলে।

স্টয়কিওমিতি: রাসায়নিক সমীকরণ থেকে মোলের হিসাব সংক্রান্ত যে তথ্যসমূহ লেখা হয় তা ঐ বিক্রিয়ার স্টয়কিওমিতি (Stoichiometry)।

লিমিটিং বিক্রিয়ক: রাসায়নিক বিক্রিয়ায় যে বিক্রিয়ক বিক্রিয়া করে শেষ হয়ে যায় সেই বিক্রিয়ককে লিমিটিং বিক্রিয়ক বলে।

অ্যানালার: রাসায়নিক বিক্রিয়ায় ব্যবহৃত যে বিক্রিয়ক সবচেয়ে বেশি (99%) বিশুদ্ধ তাকে অ্যানালার বলে।